বিবর্তন সত্য, সৃষ্টিতত্ত্ব মিথ্যা: বিতর্কের অবসান হওয়া দরকার
বিবর্তনবাদ নিয়ে বিতর্ক বিজ্ঞানীদের মধ্যে নেই। বিতর্ক আছে শুধু তাদের মধ্যে যারা একটি প্রাচীন বইকে বিজ্ঞানের উপরে স্থান দেন।
বাংলাদেশের পাঠ্যবইয়ে বিবর্তনবাদ পড়ানো হয়। কিন্তু সেই একই শিক্ষার্থী বাড়িতে ফিরে শোনে — বিবর্তনবাদ মিথ্যা, মানুষ বানর থেকে আসেনি, আল্লাহ মানুষকে মাটি দিয়ে তৈরি করেছেন। এই দ্বন্দ্বে কেউ সত্য কেউ মিথ্যা — দুটোই একসাথে সত্য হতে পারে না।
আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই: বিবর্তনবাদ সত্য। ধর্মীয় সৃষ্টিতত্ত্ব মিথ্যা। এই দুটো বক্তব্যের মাঝে কোনো "মধ্যমপন্থা" নেই। সত্য আপস করে না।
বিবর্তনবাদ কী এবং কেন এটি সত্য
বিবর্তনবাদ মানে এই নয় যে "মানুষ বানর থেকে এসেছে" — এটি একটি অতি সরলীকরণ। বিবর্তনবাদ বলে যে সকল প্রাণী একটি সাধারণ পূর্বপুরুষ থেকে ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়ে বর্তমান রূপ ধারণ করেছে। মানুষ এবং শিম্পাঞ্জি একটি সাধারণ পূর্বপুরুষ থেকে এসেছে — উভয়েই সেই পূর্বপুরুষের বিবর্তিত রূপ।
জীবাশ্ম রেকর্ড: লক্ষ লক্ষ জীবাশ্ম বিবর্তনের ধারাবাহিক প্রমাণ দেয়। মাছ থেকে উভচর, উভচর থেকে সরীসৃপ, সরীসৃপ থেকে স্তন্যপায়ী — প্রতিটি রূপান্তরের মধ্যবর্তী জীবাশ্ম পাওয়া গেছে।
ডিএনএ প্রমাণ: মানুষের ডিএনএর প্রায় ৯৮.৭ শতাংশ শিম্পাঞ্জির সাথে মিলে যায়। এই মিল কোনো কাকতাল নয় — এটি সাধারণ পূর্বপুরুষের প্রমাণ।
প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণ: ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে বিবর্তন আমরা প্রত্যক্ষ দেখেছি — অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া বিবর্তনের জীবন্ত উদাহরণ।
ভেস্টিজিয়াল অঙ্গ: মানবদেহে এমন অঙ্গ আছে যেগুলো এখন কোনো কাজে লাগে না — যেমন অ্যাপেন্ডিক্স, কানের পেছনের পেশি। এগুলো আমাদের পূর্বপুরুষদের কাছে কাজে লাগত।
সৃষ্টিতত্ত্বের সমস্যা
ধর্মীয় সৃষ্টিতত্ত্ব বলে মানুষকে ঈশ্বর সরাসরি তৈরি করেছেন — মাটি থেকে, বা কোনো অলৌকিক প্রক্রিয়ায়। এই দাবির পক্ষে কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। একটিও নেই।
সৃষ্টিতত্ত্বের সমর্থকরা প্রায়ই বলেন বিবর্তনে অনেক "ফাঁক" আছে। হ্যাঁ, বিজ্ঞানে সবসময়ই অজানা থাকে — এটাই বিজ্ঞানের সততা। কিন্তু সেই ফাঁকে ঈশ্বর বসিয়ে দেওয়া — এটি "ফাঁকের ঈশ্বর" যুক্তি, এবং এটি যুক্তিসম্মত নয়। প্রতিদিন বিজ্ঞান নতুন আবিষ্কার করে, সেই ফাঁক ভরাট হয়। ঈশ্বরের বাসস্থান ক্রমশ সংকুচিত হয়।
বিজ্ঞান ও ধর্ম: দুটি বিপরীত পদ্ধতি
বিজ্ঞান ও ধর্মের মূল পার্থক্য পদ্ধতিগত। বিজ্ঞান বলে — আমার একটি অনুমান আছে, এখন তা পরীক্ষা করব, প্রমাণ না পেলে অনুমান বদলাব। ধর্ম বলে — আমার কাছে উত্তর আছে, এখন সেই উত্তর প্রমাণ করার চেষ্টা করব, প্রমাণ না পেলেও উত্তর বদলাব না।
এই দুটি পদ্ধতি একসাথে চলতে পারে না। বিজ্ঞান এগোয় ভুল স্বীকার করে, ধর্ম টিকে থাকে ভুল অস্বীকার করে।
বাংলাদেশে বিজ্ঞান শিক্ষার সংকট
বাংলাদেশে বিজ্ঞান শিক্ষার সবচেয়ে বড় শত্রু ধর্মীয় গোঁড়ামি। যে দেশে বিবর্তনবাদকে "আল্লাহর অস্বীকার" হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যেখানে বিজ্ঞানের শিক্ষক ক্লাসে বিবর্তনের কথা বললে ছাত্ররা প্রতিবাদ করে — সেই দেশ বৈজ্ঞানিক গবেষণায় কতটা এগোতে পারবে?
বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে, শীর্ষ গবেষণাগারগুলোতে কোনো ধর্মগ্রন্থ রাখা হয় না। কারণ বিজ্ঞান প্রমাণের উপর দাঁড়ায়, বিশ্বাসের উপর নয়।
উপসংহার: বিজ্ঞান বেছে নিন
ধর্মীয় বিশ্বাস ও বৈজ্ঞানিক সত্যের মধ্যে যখন সংঘাত হয়, তখন পছন্দ করতে হবে। হাজার বছর ধরে মানুষ ধর্মকে বেছেছে এবং পিছিয়ে পড়েছে। রেনেসাঁর পর থেকে মানুষ যখন বিজ্ঞানকে বেছেছে, তখন সভ্যতা এগিয়েছে।
বিমানে উঠলে আপনি কি চান যে পাইলট বিমানচালনার বৈজ্ঞানিক নীতি মেনে চলুক, নাকি প্রার্থনার উপর নির্ভর করুক? অপারেশন টেবিলে আপনি কি চান বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা, নাকি ঝাড়ফুঁক? তাহলে জীবনের বাকি প্রশ্নগুলোতেও একই মান প্রযোজ্য হওয়া উচিত।
- চার্লস ডারউইন — On the Origin of Species (১৮৫৯)
- রিচার্ড ডকিন্স — The Selfish Gene (১৯৭৬)
- রিচার্ড ডকিন্স — The Blind Watchmaker (১৯৮৬)
- অভিজিৎ রায় — অবিশ্বাসের দর্শন (শুদ্ধস্বর)
- জেরি কোয়েন — Why Evolution is True (২০০৯)
- কার্ল সেগান — The Demon-Haunted World (১৯৯৬)