ধর্ম যখন ঘাতক: ইতিহাসের রক্তাক্ত পাঠ
ধর্মের নামে যত মানুষ মরেছে, যত সভ্যতা ধ্বংস হয়েছে, যত নারী পুড়েছে — সেই ইতিহাস কোনো ধর্মগ্রন্থে লেখা নেই।
ধার্মিক মানুষেরা প্রায়ই বলেন ধর্ম শান্তির কথা বলে, ভালোবাসার কথা বলে, মানবতার কথা বলে। আমি তাদের সাথে তর্ক করতে রাজি নই। আমি শুধু ইতিহাসের পাতা খুলে ধরতে চাই — সেই পাতা যেখানে ধর্মের নামে মানুষ হত্যার যে রক্তাক্ত উৎসব হয়েছে, তার হিসাব লেখা আছে।
ধর্মগ্রন্থে যাই লেখা থাকুক না কেন, ধর্মের ইতিহাস হলো রক্তের ইতিহাস। এবং এই রক্তের দায় কোনো বিধর্মীর নয়, কোনো নাস্তিকের নয় — এই রক্তের দায় সেই মানুষদের যারা ঈশ্বরের নামে তলোয়ার চালিয়েছে।
ক্রুসেড: প্রেমের ধর্মের রক্তের অধ্যায়
১০৯৫ সালে পোপ আরবান দ্বিতীয় যখন প্রথম ক্রুসেডের ডাক দিয়েছিলেন, তখন তিনি বলেছিলেন এটি ঈশ্বরের ইচ্ছা। হাজার হাজার সৈনিক "Deus vult" — ঈশ্বর চান — বলে তলোয়ার হাতে তুলে নিয়েছিল। জেরুজালেম পুনরুদ্ধারের পর ক্রুসেডারেরা মুসলিম এবং ইহুদি নরনারী শিশু নির্বিশেষে হত্যা করেছিল। সমসাময়িক ক্রুসেডার ক্রনিকলে লেখা আছে মসজিদে রক্ত হাঁটু পর্যন্ত উঠেছিল।
দুইশত বছরে আটটি প্রধান ক্রুসেড হয়েছিল। কত মানুষ মারা গেছেন তার সঠিক হিসাব নেই — তবে ঐতিহাসিকদের অনুমান লক্ষ থেকে কয়েক মিলিয়নের মধ্যে। এই হত্যাকাণ্ড প্রেমের ঈশ্বরের নামে হয়েছিল।
ইনকুইজিশন: যখন ঈশ্বরের ঘর নির্যাতনকেন্দ্র হয়েছিল
মধ্যযুগীয় ইউরোপে ক্যাথলিক চার্চের ইনকুইজিশন ছিল মানব ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ প্রাতিষ্ঠানিক নির্যাতনব্যবস্থা। যে কেউ চার্চের মতের বিরোধিতা করলে তাকে ধর্মদ্রোহী ঘোষণা করা হতো। তারপর শুরু হতো নির্যাতন — লোহার যন্ত্রপাতি দিয়ে, আগুন দিয়ে, শেষে পুড়িয়ে মারা।
ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা: বাংলার রক্তাক্ত অধ্যায়
১৯৪৭ সালের দেশভাগ। ধর্মের ভিত্তিতে একটি উপমহাদেশ ভাগ হলো এবং সেই বিভাজনে প্রাণ হারালেন পাঁচ থেকে দশ লক্ষ মানুষ। দাঙ্গায় হিন্দু মারল মুসলিমকে, মুসলিম মারল হিন্দুকে। উভয় পক্ষই মনে করেছিল তারা ঈশ্বরের সম্মান রক্ষা করছে।
১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাংলাদেশে গণহত্যা চালিয়েছিল। সেই হত্যাকাণ্ডকে জায়েজ করা হয়েছিল ইসলামের নামে — বলা হয়েছিল এরা নাকি কাফের, বিচ্ছিন্নতাবাদী, ইসলামবিরোধী। ধর্মের লেবাস গণহত্যাকে পবিত্র করে দেয়।
নারীর উপর ধর্মের অত্যাচার
ধর্মের ইতিহাসে নারী সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত হয়েছেন। ইউরোপে লক্ষাধিক নারীকে ডাইনি বলে পুড়িয়ে মারা হয়েছে। ইসলামি দেশগুলোতে পর্দার নামে নারীকে গৃহবন্দী করা হয়েছে, তালাকের নামে তার জীবন ধ্বংস করা হয়েছে, সাক্ষ্যের নামে তাকে অর্ধেক মানুষ বানানো হয়েছে।
বাংলাদেশে এখনও ফতোয়া দেওয়া হয়। ধর্ষিতা নারীকে শাস্তি দেওয়া হয় — ধর্ষককে নয়। যৌতুকের জন্য বধূকে পোড়ানো হয় এবং সেই সমাজ পরদিন নামাজে যায়।
ক্রুসেড ও ধর্মযুদ্ধে অনুমানিক ১০ থেকে ৩০ লক্ষ মানুষ নিহত হয়েছেন।
স্প্যানিশ ইনকুইজিশনে ৩,০০০ থেকে ৫,০০০ মানুষকে প্রাণদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
ইউরোপে ডাইনি শিকারে ৪০,০০০ থেকে ৬০,০০০ নারী প্রাণ হারিয়েছেন।
শুধু ২০২৩ সালে বিশ্বব্যাপী ধর্মীয় সহিংসতায় হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন।
উপসংহার: ক্ষমা নয়, জবাবদিহিতা চাই
ধার্মিকরা বলেন এই অপরাধগুলো ধর্মের দোষ নয়, মানুষের দোষ। আমি বলি — ঠিক আছে। কিন্তু তাহলে ধর্ম কেন এই মানুষগুলোকে থামাতে পারেনি? কেন প্রতিটি বড় হত্যাকাণ্ডে ধর্মের পতাকা উড়েছে? কেন ঈশ্বর তাঁর নামে পরিচালিত এই নৃশংসতা বন্ধ করেননি?
উত্তর সহজ। কারণ ঈশ্বর নেই। এবং যে ধর্ম তাঁকে তৈরি করেছে, সেই ধর্ম মানুষের হাতের হাতিয়ার মাত্র — কখনো ক্ষমতার, কখনো ঘৃণার, কখনো নিয়ন্ত্রণের।
- ক্রিস্টোফার হিচেন্স — God is Not Great: How Religion Poisons Everything (২০০৭)
- স্টিভেন পিংকার — The Better Angels of Our Nature (২০১১)
- হুমায়ুন আজাদ — নারী (আগামী প্রকাশনী)
- কারেন আর্মস্ট্রং — A History of God (১৯৯৩)
- অ্যান্থনি ব্ল্যাক — The History of Islamic Political Thought (২০০১)
- রিচার্ড ফ্লেচার — The Cross and the Crescent (২০০৩)