ঈশ্বরের ধারণা: মানুষের সবচেয়ে পুরনো মিথ্যা
যে সত্তার অস্তিত্বের একটিও প্রমাণ নেই, তার নামে পৃথিবী জুড়ে কোটি কোটি মানুষ মাথা নত করে — এটিই মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিস্ময়।
মানুষ যখন প্রথম বজ্রপাতে ভয় পেয়েছিল, তখনই ঈশ্বরের জন্ম হয়েছিল। সেই আদিম ভয় থেকে জন্ম নেওয়া একটি কাল্পনিক সত্তা আজও কোটি কোটি মানুষের জীবন নিয়ন্ত্রণ করছে, তাদের চিন্তাকে শৃঙ্খলিত করছে, তাদের স্বাধীনতাকে হরণ করছে। এটি মানব সভ্যতার জন্য একটি ট্র্যাজেডি — এবং এই ট্র্যাজেডির নাম ধর্ম।
আমি ঈশ্বরকে ঘৃণা করি না। কারণ যে নেই তাকে ঘৃণা করা যায় না। আমি শুধু এই সত্যটুকু বলতে চাই যা বহু শতাব্দী ধরে বলা নিষেধ ছিল — ঈশ্বরের কোনো অস্তিত্ব নেই। এটি কোনো অনুমান নয়, কোনো দুঃসাহসী মতামত নয় — এটি একমাত্র যৌক্তিক সিদ্ধান্ত।
ঈশ্বরের উৎপত্তি: ভয় এবং অজ্ঞতার সন্তান
নৃবিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন যে আদিম মানুষ প্রকৃতির শক্তিগুলোকে ব্যাখ্যা করতে না পেরে তার মধ্যে ব্যক্তিসত্তা আরোপ করত। বৃষ্টি কেন হয়? কারণ আকাশের দেবতা রেগে গেছেন। রোগ কেন হয়? কারণ অশুভ আত্মা ভর করেছে। ফসল কেন নষ্ট হলো? নিশ্চয়ই ঈশ্বর রুষ্ট।
এই অজ্ঞতাই ছিল ঈশ্বরের আঁতুড়ঘর। মানুষ যখনই কোনো কিছু বুঝতে পারেনি, সেই ফাঁকা জায়গায় ঈশ্বরকে বসিয়েছে। কিন্তু বিজ্ঞান যত এগিয়েছে, ঈশ্বরের বাসস্থান তত সংকুচিত হয়েছে। বজ্রপাতের কারণ এখন আমরা জানি — ঈশ্বরের হাতুড়ির প্রয়োজন নেই। রোগের কারণ এখন আমরা জানি — অদৃশ্য জিনের প্রয়োজন নেই। মহাবিশ্বের সৃষ্টি কীভাবে হয়েছে তাও এখন আমরা অনেকটা জানি।
ঈশ্বরের অস্তিত্বের পক্ষে যুক্তিগুলো এবং তার খণ্ডন
দাবি: সবকিছুর একটি কারণ আছে, তাই মহাবিশ্বেরও একটি কারণ থাকতে হবে — সেই কারণই ঈশ্বর।
খণ্ডন: যদি সবকিছুরই কারণ থাকে, তাহলে ঈশ্বরের কারণ কী? যদি বলা হয় ঈশ্বর কারণ ছাড়াই বিদ্যমান, তাহলে মহাবিশ্বও কারণ ছাড়াই বিদ্যমান থাকতে পারে — মাঝখানে ঈশ্বর নামক অতিরিক্ত সত্তার কোনো প্রয়োজন নেই। কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞান দেখিয়েছে যে কারণ ছাড়াই কণার উদ্ভব সম্ভব।
দাবি: পৃথিবী এত সুনিপুণভাবে সাজানো যে এর পেছনে নিশ্চয়ই একজন পরিকল্পনাকারী আছেন।
খণ্ডন: চার্লস ডারউইন ১৮৫৯ সালে এই যুক্তির সমাধি রচনা করেছেন। প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে বিবর্তন ব্যাখ্যা করে কীভাবে জটিল জীব কোনো পরিকল্পনাকারী ছাড়াই তৈরি হতে পারে। চোখের মতো জটিল অঙ্গ ধীরে ধীরে বিকশিত হয়েছে — একসাথে সৃষ্টি হয়নি।
দাবি: নৈতিকতার একটি উৎস থাকতে হবে, সেটি ঈশ্বর।
খণ্ডন: প্লেটো ইউথাইফ্রো-তে এই প্রশ্ন করেছিলেন: ঈশ্বর কি কিছু ভালো বলে সেটা নৈতিক, নাকি সেটা নৈতিক বলে ঈশ্বর তা বলেন? যদি প্রথমটি সত্য হয়, তাহলে ঈশ্বর খেয়ালখুশি মতো নৈতিকতা নির্ধারণ করেন — এটি অগ্রহণযোগ্য। যদি দ্বিতীয়টি সত্য হয়, তাহলে নৈতিকতা ঈশ্বর-নিরপেক্ষ। বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞান দেখিয়েছে যে সহমর্মিতা ও সহযোগিতার প্রবৃত্তি প্রাকৃতিক নির্বাচনের ফল।
মন্দের সমস্যা: ঈশ্বরের সবচেয়ে বড় দায়
যদি ঈশ্বর থাকেন এবং তিনি সর্বশক্তিমান, সর্বজ্ঞ এবং পরম দয়ালু হন, তাহলে পৃথিবীতে এত কষ্ট কেন? শিশুরা ক্যান্সারে কেন মরে? ভূমিকম্পে হাজার হাজার মানুষ কেন প্রাণ হারায়? দুর্ভিক্ষে শিশুরা কেন অনাহারে মারা যায়?
ধর্মতাত্ত্বিকরা এর নানা জবাব দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। কেউ বলেছেন এটি পরীক্ষা, কেউ বলেছেন এটি পাপের শাস্তি, কেউ বলেছেন এটি রহস্যময় পরিকল্পনার অংশ। কিন্তু এই সব উত্তরই একটি প্রশ্নে এসে আটকে যায় — যে শিশু জন্মের পরপরই ব্যথায় কাঁদতে কাঁদতে মারা যায়, সে কোন পাপ করেছিল?
উপসংহার: মুক্তির পথ
ঈশ্বরের ধারণা থেকে মুক্তি পাওয়া মানে শূন্যতায় পড়ে যাওয়া নয়। বরং এটি একটি মুক্তির অনুভূতি — জানলা খুলে যাওয়ার মতো, নতুন বাতাসের মতো। হঠাৎ বুঝতে পারা যায় যে এই একটাই জীবন, এবং এই জীবনকে পূর্ণভাবে বাঁচাতে হবে — কোনো স্বর্গের প্রতিশ্রুতিতে নয়, কোনো জাহান্নামের ভয়ে নয়।
নৈতিকতার জন্য ঈশ্বরের প্রয়োজন নেই। অর্থের জন্য ঈশ্বরের প্রয়োজন নেই। মানবতার জন্য ঈশ্বরের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন শুধু সাহস — সত্য দেখার সাহস, মিথ্যাকে মিথ্যা বলার সাহস।
- রিচার্ড ডকিন্স — The God Delusion (২০০৬)
- ক্রিস্টোফার হিচেন্স — God is Not Great (২০০৭)
- অভিজিৎ রায় — বিশ্বাস ও বিজ্ঞান (মুক্তমনা প্রকাশনী)
- ডেভিড হিউম — Dialogues Concerning Natural Religion (১৭৭৯)
- বার্ট্রান্ড রাসেল — Why I Am Not a Christian (১৯২৭)
- স্টিফেন হকিং ও লিওনার্ড ম্লোডিনো — The Grand Design (২০১০)