কোরআন কি সত্যিই অভ্রান্ত? একটি যৌক্তিক পর্যালোচনা
কোটি কোটি মানুষ দাবি করেন কোরআন মহাবিশ্বের স্রষ্টার বাণী এবং এতে কোনো ভুল নেই। এই দাবি কতটা সত্য, তা যুক্তি ও বিজ্ঞানের আলোয় খতিয়ে দেখা দরকার।
কোরআন পড়া নিষেধ নয়। কোরআন নিয়ে প্রশ্ন করা নিষেধ — এবং এই নিষেধাজ্ঞাটিই সবচেয়ে বড় সমস্যা। যে বই সত্যিকারের সত্য, তাকে প্রশ্নের ভয় পাওয়ার কথা নয়। আলো কখনো অন্ধকারকে ভয় পায় না।
আমি এই লেখায় কোরআনকে অসম্মান করতে চাই না। আমি শুধু একটি বই হিসেবে — যেভাবে যেকোনো বইকে বিচার করা হয় — সেভাবে বিচার করতে চাই। বৈজ্ঞানিক দাবিগুলো কি সঠিক? নৈতিক নির্দেশনাগুলো কি সর্বজনীনভাবে গ্রহণযোগ্য? ঐতিহাসিক বিবরণগুলো কি সত্য?
কোরআনের বৈজ্ঞানিক দাবি: একটি পরীক্ষা
ইসলামি পণ্ডিতরা দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছেন কোরআনে আধুনিক বিজ্ঞানের অনেক তথ্য আগেই বলা হয়েছে। এই দাবিগুলো যাচাই করা দরকার।
দাবি: কোরআনের সূরা মুমিনুনে ভ্রূণের বিকাশের পর্যায়গুলো বর্ণিত আছে যা আধুনিক ভ্রূণবিজ্ঞানের সাথে মিলে যায়।
বাস্তবতা: কোরআনে বর্ণিত পর্যায়গুলো মূলত গ্রিক চিকিৎসক গ্যালেনের তত্ত্বের সাথে মেলে, আধুনিক ভ্রূণবিজ্ঞানের সাথে নয়। আধুনিক বিজ্ঞান ভ্রূণের বিকাশে শত শত সুনির্দিষ্ট পর্যায় চিহ্নিত করেছে। কোরআনের বিবরণ অস্পষ্ট এবং যেকোনো ব্যাখ্যায় ফেলা যায়।
দাবি: সূরা আয-যারিয়াতে মহাবিশ্বের প্রসারণের কথা বলা আছে, যা বিজ্ঞানীরা ১৯২৯ সালে আবিষ্কার করেছেন।
বাস্তবতা: আরবি শব্দ "মুসি'উন"-এর একাধিক অর্থ আছে। এটি "প্রসারিত করছি" হতে পারে, কিন্তু "শক্তিশালী" বা "সমৃদ্ধ" অর্থেও ব্যবহৃত হয়। বিজ্ঞানের আবিষ্কারের পরে ধর্মগ্রন্থ পুনর্ব্যাখ্যা করা — এটি বিজ্ঞানের প্রমাণ নয়, এটি ব্যাখ্যার কৌশল।
কোরআনের নৈতিক সমস্যাগুলো
কোরআনের বৈজ্ঞানিক দাবির চেয়েও গুরুতর সমস্যা হলো এর নৈতিক নির্দেশনাগুলো। একজন সর্বজ্ঞ, সর্বদয়ালু ঈশ্বরের কাছ থেকে কী আশা করা যায়? মানবতার চিরকালীন নীতি? নাকি সপ্তম শতাব্দীর আরবের সামাজিক ব্যবস্থা?
কোরআন দাসপ্রথাকে সমর্থন করে — শুধু নিষিদ্ধ করেনি। স্ত্রীকে মারার অনুমতি দেয় — সূরা নিসার ৩৪ আয়াতে। চুরির শাস্তি হাত কাটা। ধর্মত্যাগের শাস্তি মৃত্যু — হাদিস অনুযায়ী। মুশরিকদের হত্যার নির্দেশ — সূরা তওবার ৫ আয়াতে।
হাদিসের নির্ভরযোগ্যতা
কোরআনের পাশাপাশি হাদিস ইসলামের দ্বিতীয় প্রধান ভিত্তি। হাদিস হলো নবী মুহাম্মদের কথা ও কাজের বিবরণ, যা তাঁর মৃত্যুর দুইশত থেকে তিনশত বছর পরে সংগ্রহ ও লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল।
বুখারি শরিফ — যাকে সবচেয়ে বিশুদ্ধ হাদিস সংকলন বলা হয় — সংকলিত হয়েছিল নবীর মৃত্যুর প্রায় দুইশত বছর পরে। ইমাম বুখারি নিজেই বলেছেন তিনি ছয় লক্ষ হাদিস পরীক্ষা করে মাত্র সাত হাজার সহিহ বলে চিহ্নিত করেছেন। অর্থাৎ শতকরা নব্বই ভাগের বেশি হাদিস তিনি নিজেই বাতিল করেছেন। তাহলে বাকি সাত হাজারও কতটা নির্ভরযোগ্য?
বিশুদ্ধ হাদিস অনুযায়ী মুরতাদের মৃত্যুদণ্ড বিধান রয়েছে — অর্থাৎ ইসলাম ত্যাগ করলে হত্যা করার নির্দেশ।
মহিলাদের একাকী ভ্রমণ নিষেধ।
কুকুরকে অশুচি বলা হয়েছে।
সূর্য প্রতিদিন রাতে আল্লাহর আরশের নিচে গিয়ে সেজদা করে বলে একটি হাদিসে উল্লেখ আছে।
উপসংহার
আমি কোরআনকে ঘৃণা করি না। এটি একটি ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ, সপ্তম শতাব্দীর আরবের একটি অসাধারণ সাহিত্যিক সৃষ্টি। কিন্তু এটি ঈশ্বরের বাণী নয়। এটি মানুষের লেখা, মানুষের সীমাবদ্ধতা নিয়ে লেখা, একটি নির্দিষ্ট সময় ও স্থানের কথা মাথায় রেখে লেখা।
এটিকে ঈশ্বরের চিরন্তন বাণী বলে অনুসরণ করা — এবং এই অনুসরণের নামে আধুনিক মানুষের জীবন পরিচালনা করা — এটি মানবতার প্রতি অবিচার।
- ইবনে ওয়াররাক — Why I Am Not a Muslim (১৯৯৫)
- আলি সিনা — Understanding Muhammad (২০০৮)
- অভিজিৎ রায় ও রাহাত খান — অবিশ্বাসের দর্শন (শুদ্ধস্বর)
- গার্ড পুয়িন — সানা পাণ্ডুলিপি নিয়ে গবেষণা, ১৯৯৯
- এহসান মাসুদ — Science and Islam (২০০৯)
- সাম হ্যারিস — Islam and the Future of Tolerance (২০১৫)